মিশন স্টুডেন্টকলেগ – ব্যাচেলর্স ইন জার্মানি

জার্মানিতে ব্যাচেলর করতে যাওয়াটা আমাদের অনেক বাঙ্গালী শিক্ষার্থীদের ছোট বেলার সপ্ন। অনেকেই একটু বড় হয়ে এই সপ্ন দেখেন। আসলে, বাংলাদেশি স্টুডেন্টদের জন্য জার্মানিতে ব্যাচেলর করা অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। জার্মানের শিক্ষার্থীরাই নিজেদের দেশে ব্যাচেলর শেষ করতে হিমশিম খেয়ে যায়। সেই হিসাবে আমরা অন্য একটি দেশ থেকে এসে, ভিন্ন সংস্কৃতি ও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে, নিজের খরচ নিজে খরচ নিজে চালিয়ে, জার্মান ভাষায় পড়াশুনা করে সফলতার সঙ্গে পাস করা তুলনামূলক বেশ কঠিন।

আপনার যদি জার্মানিতে আপন কেউ থাকে এবং আপনাকে থাকা-খাওয়া, চলাফেরা নিয়ে কোন চিন্তা করতে হবে না। প্রতি ক্ষেত্রে সাহায্য বা সাপোর্ট করার মত কেউ সব সময় পাশে আছেন এবং লেখাপড়ার সাথে সাথে অন্য সব বিষয়ে পারদর্শী হন, তাহলে আমাদের আজকের পোস্টটি আপনার জন্য।

বাংলাদেশে এইচ.এস.সি শেষ করার পরে সরাসরি জার্মানির ভার্সিটিতে ভর্তি বা ব্যাচেলর প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করা যায় না। কারন, সাধারণত জার্মানিতে ১৩ বছর স্কুলে পড়াশুনার পরে একজন জার্মান শিক্ষার্থী ভার্সিটিতে আবেদন করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে ১২ বছরেই আপনি ভার্সিটিতে পড়তে পারবেন। তাহলে উপায়??

-জি, উপায় আছে। ২ টি পথ আছেঃ

১। বাংলাদেশের কোন ইউনিভার্সিটিতে সফলতার সঙ্গে দুই সেমিস্টার

(এক বছর) পড়াশুনা করা এবং DSH সার্টিফিকেট ম্যানেজ করা যদি জার্মান ভাষায় ব্যাচেলরে পড়তে চান।
ANABIN এর তথ্য অনুযায়ঃ আপনাকে ২ সেমিস্টারের ট্রান্সক্রিপ্ট দেখাতে হবে। যদি DSH না থাকে, তবে আপনি ২ সেমিস্টারের ট্রান্সক্রিপ্ট এবং B1 এর সার্টিফিকেট দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনি DSH preparation course (DSH vorberatung) এ কন্ডিশনাল অ্যাডমিশন পেতে পারেন। এখন আপনি শিক্ষার্থী হিসাবে সকল সুবিধা পাবেন এবং DSH পাস করে আপনার নির্ধারিত সাবজেক্টে পড়তে পারবেন।

২। স্টুডেন্টকলেগ করাঃ

দ্বিতীয় উপায় হলো স্টুডেন্টকলেগ করা। আপনি এটি অরার মাধ্যমে জার্মানের কালচার, পড়াশুনার সিস্টেম ইত্যাদি বিষয় জানার এবং নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়ার সুবিধা পাবেন।
স্টুডেন্টকলেগ ২ সেমিস্টারের একটা কোর্স। এই কোর্সে সাধারন ফিজিক্স,কেমিস্ট্রি,ম্যাথ,ডয়েচ,ইনফরমাটিক পড়ানো হয়। অত্যন্ত প্রতিযোগিতামুলক এবং অবশ্যই কঠিন পরিক্ষার মাধ্যমে চান্স পেতে হয়, যেটাকে আউফনাহমেপ্রুফুং (Aufnahmeprüfung) বলে। যেটা বেশিরভাগ ইউনিভার্সিটি বছরে দুইবার অফার করেঃ

ক। উইন্টার সেমিস্টারঃ

উইন্টার সেমিস্টারের পরিক্ষা হয় সাধারণত জুন-সেপ্টেম্বরের মধ্যে। উইন্টার সেমিস্টারের আবেদন শুরু হয় মার্চ থেকেই সাধারনত ডেডলাইন ১৫ এপ্রিল। ইউনিভার্সিটি ভেদে সময় ভিন্ন হতে পারে।

খ।সামার সেমিস্টারঃ

সামার সেমিস্টারের পরিক্ষা হয় সাধারণত জানুয়ারি- মার্চ মাসের মধ্যে। সামার সেমিস্টারের ডেডলাইন  ১৫ অক্টোবর তবে ভার্সিটি ভেদে আলাদা হতে পারে।

আবেদন করতে যা যা লাগেঃ

  • B2 Certificate( কিছু ভার্সিটিতে B1 )
  • HSC certificate
  • CV

আর যে ভার্সিটিতে আবেদন করতে চান, সেই ভার্সিটির রিকয়ারমেন্ট অনুযায় সব কিছু।

আবেদনের জন্য দিক নির্দেশনাঃ

যতবেশি ভার্সিটিতে সম্ভব আপ্লাই করা ভাল। আপ্লাই করার আগে অনেক ভেবে , হিসাব করে করতে হবে যেন পরিক্ষার তারিখ গুলো ভিন্ন হয়। অনেক ভার্সিটিতে Uni- assist এর মাধ্যমে আবেদন করতে হয় ,কিছু ভার্সিটি তে ডিরেক্ট আবেদন করা যায়।

স্টুডেন্টকলেগ লিস্ট

এই সাইটে সবগুলো স্টুডেন্টকলেগ এর লিস্ট দেয়া আছে। এটা থেকে সব ভার্সিটির ওয়েবসাইট দেখে,পরে নিজের সুবিধা মত একটা লিস্ট বানাতে পারেন যেগুলোয় আপনি আপ্লাই করতে চান।

পরিক্ষাঃ

আপনার যদি সব রিকয়ারমেন্ট ঠিকঠাক থাকে তবে যেখানেই আপ্লাই করবেন সেখান থেকেই অফেরলেটার পাবেন কিন্তু মেইন সমস্যা পরিক্ষা দিয়ে চান্স পাওয়া । এখন এটা এতটাই কঠিন হয়ে গেছে যে, কারো কাছে থেকে এখন পর্যন্ত শুনি নাই যে, সে প্রথম এক্সাম দিয়েই চান্স পেয়েছেন। অনেকের এমনকি ল্যাঙ্গুয়েজ C1 ও করা ছিল। আবার অনেক বড় ভাই বোন আছে যারা এখানে এসে অনেক জায়গায় পরিক্ষা দিয়েছেন, জার্মানিতে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স করেছে্ন তারপর আবার পরিক্ষা দিয়েছেন কিন্তু ২/১ বছর পরে আবার দেশে ফিরে যেতে হয়েছে। তাই পরিক্ষার প্রিপারেশন টা খুব intensive ভাবে নেওয়া টা জরুরি।

পরিক্ষার প্রস্তুতি ও গাইডলাইনঃ

আউফনাহমেপ্রুফুং এ সাধারনত ডয়েচ আর ম্যাথ টেস্ট হয়। বিভিন্ন ভার্সিটির প্রশ্নের ধরন বিভিন্ন রকম যা সে ভার্সিটির ওয়েবসাইটে দেয়া মডেল টেস্ট থেকে জানা যায় । পরিক্ষায় ভাল করতে হলে সবগুলো মডেলটেস্ট করতে হবে।

Alle Prüfungsbeispiele
Aufnahmetest

ম্যাথঃ

আমরা ৯ থেকে ১২ ক্লাসে যেগুলো করেছি সেখান থেকেই থাকে কিন্তু সেগু্লো পারার জন্য অঙ্ক খুব ভাল ভাবে বুঝে করতে হবে শুধু মুখস্ত করলে হবে না। বেশীরভাগ ভার্সিটিগুলোতেই নিচের টপিক গুলো থাকেঃ

  • Lineare und quadratische Gleichungen und Ungleichungen( অনেক টাইপের সমিকরণ ,অসমতা প্রাকটিস করতে হবে)
  • Termumformungen( এটা মেইনলি বিভিন্ন term এর change করতে হয় । যেমন> সেলসিয়াস তাপমাত্রা থেকে ডিগ্রি ইত্যাদি)
  • Flächen- und Umfangsbestimmungen( জ্যামিতির বিভিন্ন আকারের ক্ষেত্রফল  ,পরিধি এগুলো বের করতে বলে এখানে অনেক ক্রিয়েটিভ প্রশ্ন হয়ে থাকে)
  • Punkte, Strecken und Geraden im Koordinatensystem( graph এর মাধ্যমে বিন্দু, সরলরেখা, বক্ররেখা, জ্যামিতিক আকার দেখানো)
  • Vorstellungsvermögen von Körpern und Figuren( trigonometric figure)
  • Strahlensätze, Satz des Pythagoras( পিথাগোরাসের উপপাদ্য দিয়ে যত প্যাচান অঙ্ক আছে সব প্রাক্টিস করবেন, উপপাদ্য সহজ হলেও অঙ্কগুলো কিন্তু কঠিন থাকে)
  • Größenanordnungen( ছোট বড় সাজান । যেমন> কয়েকটা সমীকরণ আর x,y মান দেয়া থাকবে তখন ছোট বড় সাজাতে হবে)
  • Funktionen und Funktionsgraphen( অনেক ধরনের ফাঙ্কশন থাকবে যেগুল গ্রাফ এ আকাতে হবে যেমন> circle, parabola ,hyperbola etc)
  • Trigonometric graph ( sinx, cosx etc যেমন> y= .25 sin 3x- 2 এইরকম সমীকরন আকতে হবে অথবা কোন গ্রাফে চিত্র থাকবে সেখান থেকে সমিকরণ বের করতে হবে)
  • Gebrochene rational funktion( )
  • Prozentrechnung
  • Calculus(intigration, differentiation)(HSC calculus enough)

„Brückenkurs Mathematik“(Karl Bosch) এই বইটা অনেক ভাল এখানের সব অঙ্কগুলা করলে জার্মান ম্যাথেমেটিক টার্মগুলোও আয়ত্তে আসে সাথে সাথে কিভাবে অঙ্ক করতে হয় সেগুলও জানা যায়। এছাড়াও জার্মানির বাচ্চারা স্কুলে যে বইগুলো পরে সেগুল কোনভাবে যোগার করে পরতে পারলে খুব ভাল হয়।

কয়েকটা ওয়েবসাইট থেকেও পরা যেতে পারে যেমন> 

⦁ http://www.mathe1.de/
⦁ http://www.klassenarbeiten.net/
⦁ https://www.mathebibel.de/
⦁ http://www.mathe-aufgaben.de/

Practice makes a man perfect . তাই  যত বেশি প্রাকটিস তত ভাল। আর জার্মান ভাষার ম্যাথেমেটিক টার্মগুলো খুব ভাল ভাবে মনে রাখতে হবে। মডেল টেস্ট গুলোয় যে টাইপের অঙ্ক থাকে সেগুলোই বিস্তারিতভাবে জেনে বুঝে প্র্যাক্টিস করতে হবে।

ডয়েচ পরিক্ষাঃ

ম্যাথ পরিক্ষা ডয়েচ এর থেকে অনেক সহজ। আপনার জার্মান লাঙ্গুয়েজ পরিক্ষার উপরি নির্ভর করবে আপনি চান্স পাবেন কিনা। কেননা ম্যাথ প্রায় সবাই পারে। আপনি ম্যাথে ১০০% পান কিন্তু যদি ল্যাঙ্গুয়েজ এ পাস মার্ক না উঠে তাহলে চান্স হবে না। ডয়েচেও বিভিন্ন ভার্সিটির প্রশ্নের ধরন আলাদা।কিন্তু সব ভার্সিটিতেই c-test পার্ট থাকে । তাই যত বেশি সম্ভব প্রাক্টিস করতে হবে। ডয়েচ পরিক্ষার প্রশ্নে সাধারণত এই গুলি থাকেঃ

  • TU Darmstadt এ 4 টা C-Test. এখানে Model Test কিন্তু মেইন এক্সামের টা আরও কঠিন।
  • Bochum এর Hören, Lesen, Schreiben,C Test. এখানে Model Test।
  • KIT(karlsruhe) তে Onset এ এক্সাম হয় । বিস্তারিত এখানে Onset.

ল্যাংগুয়েজ পরিক্ষা তুলনামুলক অনেক কঠিন। আপনাকে অনেক প্রাক্টিস করতে হবে। অনেক বলতে, প্রচুর পরিমানে প্রাক্টিস করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের পরামর্শ অনেক রেডিও  শুনতে হবে , টিভি দেখতে হবে ডয়েচ এবং বই পরতে হবে। গ্রামার এর জন্যে সাজেস্ট করবো  Lehr und Übungsbuch Deutschen Grammatik  বইটি। আর গুগল এ যত c-Test সবগুলো করতে হবে। যখন দেখবেন আপনি প্রাই ৭০% র মত পারছেন তখন আপনার চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আশা করি যারা জার্মানিতে যেতে চাম্ন তারা খুব ভাল মত প্রেপারেশন নিয়েই অ্যাপ্লাই করবেন, কেননা, জার্মানি শুধু বেড়ানোর জন্যে না। এখানে ভালমত পড়াশুনা করে শুধু নিজের না আমরা সবাই যেন দেশেরও মুখ উজ্জ্বল করতে পারি । আপনার জন্য রইল অনেক শুভকামনা। ধন্যবাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top